বুধবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০১৭

শীতকাল ("Sheetkaal" or, Winter)


শীতকাল 

সবাই তো ছোটবেলায় "বঙ্গে বর্ষা", "গ্রীষ্মকাল", ইত্যাদি রচনা লিখেছে - কেউ কি "বঙ্গে শীতকাল" শীর্ষক রচনা লিখেছে ? 

মনে হয় না, কারণ বাঙালির জন্য শীতকালটা বড় ভয়ংকর। এমনকি কবিগুরুও শীতকাল নিয়ে গোটা কয়েক গান লিখেছেন মাত্র - গীতবিতানে গুনলাম; শুধু দশ - বারোটা গান  আছে। তার মধ্যে আবার কিছু গান খুব কম গাওয়া হয়েছে, বা গাওয়াই হয়নি । 

Monkey cap পরে গান গাওয়া তো কষ্টকর, তাই বোধ হয় ওগুলো আর কেউ গেয়ে উঠতে পারেনি। অথবা কবিগুরু জানতেন শীতের গান তো সবাই monkey cap পরে গাইবার চেষ্টা করবে, সেই ভাবনায় বিরক্ত হয়ে বেশি লেখেননি। 

বিগত সত্তর বছরে আমাদের শিক্ষাকর্তারাও কবিগুরুর থেকে খুব একটা উৎসাহ না পেয়ে ওই কালটাকে পড়াশুনোর গণ্ডির বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছেন। রচনা লিখতে গেলে কিছু উদ্ধৃতি চাই তো ! সেখানে টান পড়লে তো মুশকিল !! ফলে শীতকাল নিয়ে কারুর আর রচনা লেখা হয়নি। 

সেই ছোটবেলাকার অতৃপ্ত বাসনা এই বুড়ো বয়সে পূরণ করতে গিয়ে এটা লিখতে বসলাম। উদ্ধৃতি ছাড়াই। 

বাংলাদেশে লোকে বলে ছয় ঋতু, আমি বলি দুই - শীতকাল, আর বিভিন্ন বৈচিত্রের গরমকাল, যেমন বসন্ত, গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ - এই চারটে ... হ্যাঁ, ঠিকই বলছি, চারটে। হেমন্ত কিম্বদন্তী গায়ক হয়ে যাবার পর ওই কালটা ঋতুমালা থেকে উঠে গেছে। 

শীতকাল বলতে গেলে কয়েকটি কথা মনে আসে, যেমন  শাক-সব্জি, ভারী লেপ, কুটকুটে কম্বল, হাতে পায়ে খড়ি ফোটা,  হাসতে গিয়ে ঠোঁট ফেটে রক্ত পড়া, গায়ে glycerine সাবান মাখা, ঠোঁটে boroline মাখা, রোদে বসে হালকা গরম সর্ষের তেল মাখা, গরম জামা, muffler.... আর monkey cap। (ইদানিংকালে মশাও যোগ করা যেতে পারে।)    

জন্ম থেকে boroline দেখে আসছি, সেই সবুজ টিউব, যেটাকে ধীরে ধীরে চটকে একেবারে শাকভাজা বা করলা ভাজার মতন করে ক্রিম বার করা হয়।  তারপর ওই টিউবটা অমরত্ব লাভ করে, ক্রিম আর কিছুতেই ফুরোয় না, একটু একটু করে বেরোতেই থাকে। ছোটবেলায় অনেক চেষ্টা করেও ক্রিম শেষ করতে পারিনি, শিশু মনের ধৈর্য অতিক্রম করে সেই চটকানো টিউব থেকে ক্রিম বেরোতেই থাকত। নতুন টিউব চালু হবার পরেও টেবিলে ড্রয়ারে আনাচে - কানাচে ওই টিউব গুলো পড়ে থাকে, আর একটু একটু করে ক্রিম বেরোয়। এখনো মাঝে মাঝে দুঃস্বপ্নে আমি বোরোলিনের গন্ধ পাই, সেই ছোটবেলায় মা জোর করে চেপে ধরে মাখিয়ে দিতেন - সেই স্মৃতি আজও প্রখর। 

শীতকাল মানে বাঙালি মহিলা আর boroline ; বাঙালি পুরুষ আর monkey cap, মাঝখানে glycerine সাবান !!

আর এই monkey cap যে কি অনবদ্য সৃষ্টি, কি বলব !! এটা যে কি করে বাঙালির শীতের চিরসাথী হলো, জানিনা। আজ থেকে প্রায় ৩০ বছর আগে আমি জীবনে প্রথম ডলার জিতেছিলাম এই monkey cap এর জন্য !!

August মাস, California তে চূড়ান্ত গ্রীষ্মকাল। Golden Gate Bridge এ বেড়াতে গেছি। ওই অঞ্চলের কনকনে হওয়া আর গনগনে রোদ্দুরের সাথে  অনেকেরই পরিচয় আছে। বেলা এগারোটা। ব্রিজের দুই ধার দিয়ে কাতারে কাতারে মানুষ হাঁটছে। মাঝখানে ছয় লেনের রাস্তায় সাই সাই করে গাড়ি যাচ্ছে। হঠাৎ দূরে দেখি দুটো monkey cap পরা মানুষ। অনেক দূরে, মুখ দেখা যাচ্ছে না, খালি cap দুটো বোঝা যাচ্ছে।  
বললাম, "দেখ দিদি, বাঙালি !!" দিদি বলল, "ধুৎ, এখানে অনেকেই monkey cap পরে।"
"হতে পারে, কিন্ত সকাল বেলায় এই চড়া রোদ্দুরে ? নিশ্চই বাঙালি।  বাজি ধরবি ?"
"ঠিক আছে - দশ ডলার।" 
কথা বলতে বলতে আমরা এগোচ্ছিলাম, ওরা আমাদের দিকেই আসছিল। কিছুক্ষন পরে আমাদের পাশ দিয়েই কথা বলতে বলতে পেরিয়ে গেল। 
"দেখছোস, দেখছোস, কি সুন্দর নৌকাটা ?"
অপর জন বলল, "তা ঠিক, কিন্ত কি ঠান্ডা হাওয়া, ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে পাচ্ছিনা।"

দিদি চুপচাপ আমাকে দশ ডলার দিয়ে দিল ...  কি আনন্দ হয়েছিল, আজও ভুলিনি।

সর্দারজীর পাঁচটা "ক" এর মতন বাঙালির পাঁচটা "চ" আছে : চটি, চাদর, চশমা, চারমিনার, চা - এই হল পরিচয়, বিশেষ করে শীতকালে। 

আর কাশ্মীরে বরফ পড়লে তো কথাই নেই - টানা কয়েক দিন এই বাংলায় স্নান-টান বন্ধ, গ্লিসারিন সাবানটা শুকিয়ে কাঠ !! হোক না দূরত্ব কয়েক হাজার মাইল, ঠান্ডা তো পড়েছে, না কি !!

বাঙালির তো সারা বছর "ঠান্ডা" লাগে - গ্রীষ্মের প্রচন্ড দাবদাহতেও "ঠান্ডা" লাগে, ওষুধও খেতে হয়, ডাক্তারের কাছে যেতে হয় !! এই ব্যাপারটা আমি আজও বোঝার চেষ্টা করছি।

মজার ব্যাপার, শীতকালে কিন্ত সেই ঠান্ডা লাগে না - বোধহয় monkey cap এর জন্য, তাই না ?

কয়েকজন আবার মাফলারটা বেশি ভালোবাসে। গলায় আর মাথায় জড়িয়ে, মাথাটাকে একটা সিঙ্গাড়ার আকৃতি দিয়ে বেরিয়ে পড়ে। বাড়ি ফেরা পর্য্যন্ত আর খোলা নেই - হোক না মাঝে ঝাঁঝাঁ রোদ্দুর। ওদের দেখেই বোধ হয় কবি লিখেছিলেন, "এ কি মায়া লুকাও কায়া জীর্ণ শীতের সাজে ?"
এই যা !! উদ্ধৃতি দিয়েই ফেললাম !!

কি করব ? ছেলেবেলাকার অভ্যেস - সেই কথায় বলে না, "স্বভাব যায় না ম'লে".....