রবিবার, ২৮ অক্টোবর, ২০১৮

লাল, নীল, সবুজ কলম (Red, blue and green pens)



আজকাল লোকে তো কলম দিয়ে লেখাই ভুলতে বসেছে ... হয় কম্পিউটারের কিবোর্ড আর না হয় ফোনে বুড়ো আঙ্গুল দিয়েই সব বক্তব্য প্রকাশ করে ফেলে।  পরবর্তী প্রজন্মর তো বুড়ো আঙুলে ব্যাথা, কব্জিতে অস্ত্রপচার, কত কি হচ্ছে এই কিবোর্ড আর ফোন টেপার দয়ায়। 

মাঝে মাঝে ভাবি, আমরা ছোটবেলায় এতো বকুনি, এতো শাস্তি পেয়েছি, খারাপ হাতের লেখার জন্য, এমন কি পরীক্ষায় কম নম্বরও পেয়েছি - সবই কি বৃথা গেল ? এখন আমিও তো সংসারের হিসেব আর চেক সই করা ছাড়া কলম ব্যবহার করিনা। 

যাকগে, আসল গল্পটাতে আসি....আজ থেকে প্রায় তিরিশ বছর আগেকার কথা - তখন অত কম্পিউটারের ছড়াছড়ি হয়নি, সবেমাত্র কিছু জায়গায় কম্পিউটার বসতে শুরু করেছে।  তখন প্রায় সব অফিসেই স্টেনোগ্রাফার আর সেক্রেটারিদের দল সারাদিন টাইপরাইটার এ টরেটক্কা করে জীবন কাটাতো। চিঠিপত্র ডাকঘর বা কুরিয়ার দিয়ে যেত, আর না হলে ফ্যাক্স। 

সেই সময়ে বিভিন্ন অফিসের বড় বাবুরা পকেটে তিন চারটে কলম নিয়ে ঘুরে বেড়াতো। যার যত ক্ষমতা, তার তত বেশি কলম। ম্যানেজারদের পকেটে তো গোটা তিনেক কলম থাকতই, টেবিলে সাজানো থাকত আরও গোটা চারেক। 

আমি যে কোম্পানিতে কাজ করতাম, তারা কম্পিউটার এবং আনুসাঙ্গিক অনেক কিছু বেচতো, আমিও ছিলাম এক প্রকারের বেচুদা। একটি সংস্থা কে কোম্পানি কিছু মালপত্র দিয়েছিল, বিক্রি-বাটা  হয়েছিল তখনকার বম্বে শহরে। সেই সংস্থার হেডঅফিস ছিল কলকাতায়।  আমি এই ব্যাপারে জানতেও পারতাম না, যদি সব কিছু ঠিক ঠাক থাকত। 

হলো কি, তারা প্রায় ছয় মাস বেশ কিছু টাকা বাকি রেখে দিল - ব্যাপারটা আমাদের হেডঅফিসে গেল, সেখান থেকে আমার ওপর হুকুম হলো ওদের হেডঅফিস থেকে টাকা বার করার, কারণ আমার কলকাতার অফিস থেকে ওদের হেডঅফিস হাঁটা পথে পাঁচ - ছয় মিনিটের রাস্তা। 

তখন অল্প বয়স, দারুণ উদ্যোগ নিয়ে চলে গেলাম ওদের অফিসে, একেবারে সোজা চারতলায়, যেখানে ওদের সব প্রেসিডেন্ট আর ভাইসপ্রেসিডেন্ট বসতো। জনৈক ভদ্রলোককে জিজ্ঞেসাবাদ করে, এই কেনা-বেচার মালিক যে ছিল, তার কাছে পৌঁছে গেলাম। তিনি একজন ভাইসপ্রেসিডেন্ট। বাঙালি। 

আমাকে বসতে বললেন, সবিস্তরে পুরো কাহিনী শুনলেন, মস্ত বড় জীভ কেটে বললেন, "আপনারা এখনো টাকা পাননি ? কি লজ্জার কথা !!" আমি একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। 

বললেন, "ইনভয়েস এনেছেন ?" আমি সাথে সাথে ওনাকে ব্যাগ থেকে ইনভয়েস বার করে দিলাম। ডুপ্লিকেটে। উনি পড়ে দেখে বললেন, "দেখুন তো, কি কান্ড ? আমি এটা সই করে দিচ্ছি, আপনি ছয়তলায়  গিয়ে একাউন্টস সেক্শনে জমা করে দিন।"

"কবে টাকা পেতে পারি ?" 

"আগে ইনভয়েসটা জমা করুন তো, তারপর দেখছি", এই বলে, পকেট থেকে সবুজ কলম বার করে লিখে দিলেন - "please pay immediately."। তারপর সই করে তারিখ দিলেন। আমি খুশি মনে ধন্যবাদ জানিয়ে চলে গেলাম ছয়তলায়। মনে মনে ভাবলাম এটা কি সহজ কাজ, যদি করে দিতে পারি তো নিশ্চয়ই নাম কিনব। 

ছয়তলায় গিয়ে দেখি সব তিলকধারি, গেরুয়া বসন-পরিহিত মুনীবজিদের ছড়াছড়ি। তারাই নাকি একাউন্টস ডিপার্টমেন্ট !!  টেবিল - চেয়ার নেই, সবাই ধব-ধবে সাদা চাদর মোড়া তাকিয়াতে বসে মস্ত বড় বড় লাল খাতায় ব্যস্ত হয়ে হিসেব করছে। কম্পিউটার একটাও নেই।  একবার মনে ভাবলাম যে এতো টাকা দিয়ে যে দুটো কম্পিউটার কিনেছে সেগুলো কই ?

বেশি কিছু ভাববার আগেই একজন বললো, "কিসসে মিলনা হায় ?" আমি নাম বললাম। সে আমাকে ঘরের কোণে এক বৃদ্ধ মানুষকে দেখিয়ে দিল। গেলাম তার কাছে। সে কোনো কথা না বলে হাত বাড়িয়ে দিল। আমি ইনভয়েস গুলো দিলাম। সে পড়ে দেখে বললো, "আগলা মাহিনা কা দস তারিখ আইয়ে।" আমি বলতে গেলাম যে আমার তাড়া আছে পেমেন্ট নেবার, সে নির্বিকার চিত্তে বললো, "বোলা না, দস তারিখ কো আইয়ে।" হতাশ হয়ে অফিস ফিরে বসকে জানালাম। আরও তিন সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হবে। বস বললো, "ঠিক আছে, লেগে থেকে পয়সাটা বার করো।" .

কি আর করব ? পরের মাসে দশ তারিখে গিয়ে হাজির হলাম সেই তিলকধারী বুড়োর কাছে। দেখি ওনার আসন খালি, উনি নেই। খোঁজ খবর করে জানলাম ওই বুড়ো গত মাসে চাকরি থেকে অবসর নিয়ে চলে গেছেন !! আমার ইনভয়েস এর খবর কেউ জানেনা। 

ফিরে চারতলায় গিয়ে সেই ভাইসপ্রেসিডেন্ট কে আবার ধরলাম।  তিনি সব ঘটনা শুনে বললেন, "এদের যে কি ব্যাপার আমিও বুঝতে পারিনা। আপনি এক কাজ করুন  - আমাকে আবার ইনভয়েস এর কপি দিন।  আছে সঙ্গে ?"  আমি বললাম, "না... আমি তো পয়সা নিতে এসেছিলাম, ইনভয়েস তো নেই।" উনি একটা করুণার  হাসি হেসে আমাকে আবার ইনভয়েস আনতে বললেন। 

অফিসে ফিরে বসকে জানালাম। বস আবার ডুপ্লিকেট ইনভয়েস দিন চারেক পরে কুরিয়ার দিয়ে পাঠালেন।  সেটা নিয়ে আবার ছুটলাম ওই ভাইসপ্রেসিডেন্ট এর কাছে। তিনি এক গাল হেসে বললেন, "এবার ব্যবস্থা করছি।" দেখলাম তিনি নীল কলম দিয়ে আবার লিখলেন, "please pay immediately." তারপর সই, তারিখ, ও ছাপ মেরে আমাকে দিলেন। 

"কার কাছে যাবো ?" তিনি কিছুক্ষণ আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে, কিছু ভেবে, বললেন যে ছয়তলাতে গিয়ে দেখবেন একটা ভেন্ডর সেকশন হয়েছে, সেখানে দেবেন। আমি আবার ছুটলাম ছয়তলায় সেই তিলকধারী মুনীবজিদের পাড়ায়। দেখি ভেন্ডর সেক্শনে একটি বিকট মোটা, অল্প বয়েসী ছেলে বসে আছে, যাকে দেখলেই মনে হয় রোজ সকালে জল-খাবারের বদলে মারধর খেয়ে আসে। তাকে গিয়ে বললাম, "ইনভয়েস ইধর দেনা হায় ?"

সে আমাকে আপাদমস্তক কিছুক্ষণ নিরীক্ষণ করে বললো, "হাঁ।" বললাম যে আপনাদের ভাইস প্রেসিডেন্ট লিখে দিয়েছে, কবে পেমেন্ট পেতে পারি ? সে আবার আমাকে আপাদমস্তক কিছুক্ষণ নিরীক্ষণ করে বললো, "আগলা মাহিনা।" আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম।  ওকে বললাম সেই ভাইস প্রেসিডেন্ট কে ফোন করতে।  সে একদম নারাজ।  শেষে আমি নিচে গিয়ে ওই ভদ্রলোককে বললাম।  তিনি বললেন, "আমি কথা বলছি।" তিনি পাশের ঘরে গিয়ে ইন্টারকম এ কিছুক্ষণ কথা বলে এসে জানালেন যে তিনি দুই সপ্তাহের মধ্যে টাকাটা বার করে দেওয়ার চেষ্টা করবেন। সন্দেহ হলো, কারণ ওনার ঘরেও ইন্টারকমটা ছিল। 

যাই হোক দু সপ্তাহ পরে আবার গেলাম।  তিনি বললেন ওপরে গিয়ে খোঁজ করতে। ওপরে গিয়ে সেই মোটা ছেলেটার কাছে দাঁড়াতেই সে বললো, "মাফ কিজিয়ে, আপ কা ইনভয়েস গুম হো গিয়া, এক অউর ইনভয়েস কপি মিলেগা ?" 

সে কি !! এ তো বিনা মেঘে বজ্রাঘাত !! আবার সেই ভাইসপ্রেসিডেন্ট এর সাথে দেখা করে অফিস ছুটলাম।  বস কে জানালাম ঘটনাটা। আবার চার - পাঁচ দিন পরে ইনভয়েস এলো। নিয়ে সোজা গেলাম সেই ভাইস প্রেসিডেন্ট এর কাছে।  তিনি বললেন, "আহা, আপনাকে কত ঘোরাচ্ছে।... আমি এক্ষুণি সই করে দিচ্ছি।"

আমি বললাম, "স্যার সবুজ আর নীল কলমে তো কাজ হলোনা, লাল কলমে সইটা করবেন ?" তিনি ভূত দেখার মত আমার দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন।  বুঝলাম ঠিক ধরেছি !! চাপ দিলাম।  "প্লিজ লাল কলমে সই করুন।" তিনি কি ভাবলেন, করে দিলেন।  লাল কলমে। 

ওপরে গিয়ে ইনভয়েসটা দিতেই সেই মোটকা ছেলেটা উঠে বসলো। আমাকে দেখলো তারপর ইনভয়েস নিয়ে ভেতরের ঘরে চলে গেলো। আমি কি আর করি, বাইরে হলঘরে দাঁড়িয়ে রইলাম। প্রায় আধ ঘন্টা পরে ও বেরিয়ে এলো, আমাকে দেখে অবাক। বুঝিয়ে দিলাম আমি চেক ছাড়া যাচ্ছিনে। ও বললো লাঞ্চ এর পরে আসতে। আমি বললাম, "আজ আমার উপোষ, লাঞ্চ করবনা, এখানেই বসছি, এই তাকিয়াতে, আপনারা লাঞ্চ করুন, তারপর আমাকে চেক দিন।"

সে ব্যাপারটা বেগতিক দেখে আবার ভেতরের ঘর চলে গেল। এক ঘন্টা পরে চেক পেলাম হাতে। 

সেই থেকে আমার শিক্ষা হলো :
"সবুজ কলমে গোলমাল, নীল কলমেও তাই -
টাকা যদি পেতে হয়, লাল কলম চাই !!"

***
আপনারা যদি এটা পড়ে উপকৃত হন, তো জানাবেন।  
***







রবিবার, ২০ মে, ২০১৮

হোমিওপ্যাথি ওষুধের বাক্স (The box of homeopathy medicines)

আমার বাবার ওষুধ নিয়ে পড়াশুনো করার অভ্যাস ছিল।  বাড়িতে প্রচুর মেডিসিনের বই ছিল - তখন তো আর ইন্টারনেট ছিল না, তাই বইই  ছিল একমাত্র সম্বল। শুধু পড়াশুনো নয়, সেই বিদ্যা প্রয়োগও করতেন।  আমাদের ওপর।

আর সুযোগও ছিল - আমি তো প্রায়ই জ্বর - কাশিতে ভুগতাম, ঈশান কোণে মেঘ দেখা দিলে নাক দিয়ে জল গড়াতো, যখন তখন টন্সিল ফুলে যেত;  দিদি একটু কম। ফলে বিভিন্ন রকম ওষুধ খেয়েছি, বেশীর ভাগ জঘন্য খেতে - যেমন পাড়ার  ডাক্তারের লাল - সবুজ মিক্সচার, Waterbury's Compound, Phosphomin, কালমেঘ (উঃ - মাগো, কি তেতো ছিল ওটা), আরো কত কি... (পাড়ার  ওষুধের দোকানদার  বাবাকে  "trained chemist" ভাবতো, বহুদিন পরে তার ভুল ভেঙেছে। )

এর মধ্যে মাঝে মাঝে হোমিওপ্যাথি ওষুধও চলতো - Hepar Sulphur, Ipecac, Colchicum, Belladona, Nux Vomica, Baryta Carb. ... এই কটাই  মনে পড়ে,  আরও হয়ত ছিল। কোন ওষুধের কি কাজ ছিল জানিনা, এটা মনে আছে যে সবই ছোট ছোট চিনির গোলা, আর প্রায় একই রকম গন্ধ। বাবা গুনে গুনে কখনো চারটে গোলা, কখনো ছ' টা গোলা দিতেন।  তাতে জ্বর সারতো কি না মনে নেই।

ওষুধগুলো থাকতো একটি ছোট কাঠের বাক্সে, তার ভেতরটা ছিল কালো, আর বাইরেটা চকচকে কাঠের পালিশ।

ছোটবেলার স্মৃতিতে পরিষ্কার ছবি এখনো ধরা আছে - দরজার পেছনে বা খাটের তলায় লুকিয়ে আমি আর দিদি, বা আমার কোনো বনধু, বাবার সেই হোমিওপ্যাথি ওষুধের বাক্সটা নিয়ে একটার পর একটা বোতল খুলে দু-চারটে করে চিনির গোলা ঢেলে ঢেলে খেতাম। উঃ সে কি আনন্দ !! সেযুগের বিটকেল স্বাধের ওষুধগুলোর কাছে এটা ছিল যেন নকুলদানার ছোটভাই !

কখনো বেশী খাওয়া হয়ে গেলে, বাবা দেখতাম নতুন ওষুধের শিশি নিয়ে আসতেন। ওষুধ চুরি বুঝতেন কি না জানিনা, কিনতু কোনো দিন প্রশ্ন করেননি। 

ওই হোমিওপ্যাথি ওষুধের যে ছোট ছোট কাচের শিশি হত, সেগুলো আরও একটা কাজে লাগত - ঠোঁটের কাছে ধরে খুব সুন্দর শিষ দেওয়া যেত - আপনারা কেউ  চেষ্টা করেছেন কখনও ?

এই রোগ-ভোগান্তি আর ওষুধের মধ্য দিয়ে কখন বড় হয়ে গেছি টের পাইনি।  বাবা চলে গেছেন প্রায় দশ বছর আগে। সেদিন বাবার ঘরটা পরিষ্কার করতে গিয়ে একটি প্লাস্টিকের ব্যাগ থেকে বেরোলো আমার সেই ছোটবেলাকার প্রবল কৌতুহলের আর আনন্দের উৎস - সেই হোমিওপ্যাথি ওষুধের বাক্স !! 

তাতে আজও কিছু ওষুধের শিশি আছে। রেখে দিয়েছি যত্ন করে। 

শুনেছি আজকাল নাকি ওই শিশি আর পাওয়া যায়না - সবই প্লাস্টিকের। ওই রকম বাক্সও বোধ হয় পাওয়া যায়না। যুগ বদলে গেছে।