সোমবার, ১৪ ডিসেম্বর, ২০২০

শেষের আলো (Last light of the day)

 শেষের আলো 

দিনাবসানের করুণ আলো আমার বাতায়নে,

যাবার আগে কী বলে যায়, খুঁজে না পাই মানে।

আসবে আলো নিয়ে আবার নতুন ভোরের সাজ,

মনে যে আজ কথা বাকি, বাকি কত কাজ !!






শনিবার, ১৪ নভেম্বর, ২০২০

নীরব দীপাবলী (Silent Deepavali)

 মাঝে মাঝে পাখির ডাক  

দূরে বাজছে পূজোর ঢাক -

            চারিদিক তো শান্ত, নিরিবিলি। 

নেই আকাশে রঙের ছটা 

রকেট - ফানুস - তুবড়ি - ঘটা -

            মনে আজ দুঃখ জাগায় নীরব দীপাবলী ।

একটি দিনের বায়ু দূষণ তো 

বন্ধ করলে আজি -

বাকি দিনের সেই প্রবল দূষণ -

          রুখতে পারবে, কাজী ??

শনিবার, ৭ নভেম্বর, ২০২০

গ্রাহক পরিষেবা - Do we understand "Customer Service" ?

আমরা কি কাস্টমার সার্ভিস (গ্রাহক পরিষেবা ) বুঝি ?


আপনার ব্যাংকটা বাড়ির কোন তলায় ? গ্রাউন্ড ফ্লোর বা একতলায় কি ? তাহলে বেঁচে গেলেন। বেশীর ব্যাঙ্ক দেখি তাদের শাখাগুলোকে ফার্স্ট ফ্লোর, যাকে বলে দোতলায় রাখে, এবং কিছু ডিপার্টমেন্ট তিনতলায় !!

সেই সব ব্যাংকে অবসরপ্রাপ্ত, অথবা ষাটের ওপর বয়স্ক লোকজনদের আনাগোনা লক্ষ্য করেছেন কি ? তাদের দেখে নিজের ভবিষ্যতের চিন্তায় আমি শিউরে উঠি।  দোতলায় ওঠা, আর আর চকচকে পাথর বসানো মেঝে আর সিঁড়ি দিয়ে যাতায়াত করা কি সাংঘাতিক ! 

আমরাই খুব সন্তর্পনে পা ফেলি, যাঁরা লাঠি বা ওয়াকার নিয়ে আসেন, তাদের কি অবস্থা বলুন তো ?

 শুধু ব্যাংক কেন ? কর্পোরেশন এর অফিস ট্যাক্স জমা করতে হয় ? তিনতলা আর চারতলা উঠতে হয় ? আর অফিস এর বাইরে ঘন্টাখানেক দাঁড়াতে হয় ? সরকারি বাবুরা দয়া করে ট্যাক্স জমা নেবেন বলে ? 

কোনো সরকারি অফিসে একবার গিয়ে কাজ হাশিল করতে পেরেছেন ? কোনো না কোনো কারণে তিন থেকে চারবার ঘুরিয়ে ছাড়ে ! "আজ তো হবেনা, অন্য দিন আসতে হবে" - এই কথা নিশ্চয় আপনাদের বহুবার শোনা। বাবু চেয়ার এ থাকেন না, থাকে তার চশমা আর কোট। 

বলি, মাইনেটা বাবু পায় না ওর কোট পায় ?

এইরকম উদাহরণ দিতে গেলে এই লেখা আর শেষ হবেনা !!

***

বেশ কিছু বছর আগেকার কথা বলছি - কিছু ছেলে-মেয়ে গিয়েছিল অন্য একটা দেশে প্রজেক্ট করতে। নতুন দেশে শুরুতে একটু আধটু অসুবিধে তো হবেই ! তাতে লোকজন ক্ষেপে গিয়ে তাদের সেলস কে গালি-গালাজ করতে লাগল - "কাঁহা কাঁহা সে কাস্টমার লাতা হায় !! কাস্টমার ভি উল্লু হায়, জো হামকো অর্ডার দেতা হায় !!"

বেশির ভাগ লোকের ধারণা বিদেশ মানে ইংল্যান্ড - আমেরিকা, আর এর বাইরে যে আরো একশো কুড়ি খানা দেশ আছে এবং সেখানে লোকজন থাকে আর কিছু কিছু ব্যাপারে এদেশের থেকে অনেক উন্নত সেটা বিশ্বাসই করেনা। কাজেই ওই সব দেশে কাজ করতে গেলে মুখ হাঁড়ি !!

"কাস্টমার ভি উল্লু হায়, জো হামকো অর্ডার দেতা হায় !!" - এই চিন্তাটা এবং উক্তিটি আমি বার বার উপলব্ধি করেছি  বা শুনেছি  আমার কর্মজীবনে।  কোন শিক্ষা থেকে এটা আসে আমার জানা নেই !

***

স্কুলে সন্তান ভর্তি করতে গিয়ে মনে হয় কি ভুলই না করেছি সন্তান কে জন্ম দিয়ে ! প্যারেন্ট -টিচার মিটিংএ গিয়ে বুঝি যে আমার ছেলেটির মতো দুষ্ট আর নচ্ছাড় বাচ্চা ইতিহাসে নেই। বাচ্চা গুলো সারাদিন ভোম্বলের মতো কথা না বলে, লাফালাফি না করে, অবাক হয়ে টিচার এর দিকে তাকিয়ে বসে থাকলে তবেই টিচার খুশি ! ওদের নিজের বাচ্চা কি করে জানতে ইচ্ছে করে। 

শিশুকে ভালো না বেসে শিশুকে পোড়ানো নৈতিক ভাবে অনুচিত। মূল্যবোধের ব্যাপার - এবং আজ সে মূল্যবোধ কোথায় ? 

এদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা মূল্যবোধের অভাবে উন্নতি করতে পারেনি এটাই আমার ধারণা - তাই এদেশের ছাত্র - ছাত্রীরা বিদেশে গিয়ে এতো ভালো কাজ করে, এদেশে নয়। 

***

ইংল্যান্ড - আমেরিকা সহ বহুদেশে দেখেছি যে পাবলিক অফিস আইনত ভাবে গ্রাউন্ড ফ্লোর এ থাকে, গ্রাহকদের আরামের জন্য বাতানুকূল পরিবেশ, বসার জায়গা থাকে, অপেক্ষার লাইন লম্বা হয়ে গেলে নতুন কাউন্টার খুলে দেয়, বাইরে গাড়ি রাখার ব্যবস্থা থাকে। 

এ দেশে কবে হবে এই সব ? কবে আমরা বুঝবো গ্রাহক পরিষেবা সাধারণ লোকের সেবা করার জন্য, তাদের শাস্তি দেওয়ার জন্য নয় ?

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো তাদের মূল্যবোধ কে নতুন করে মূল্যায়ন করুক - যাতে ভবিষ্যতের প্রজন্ম সঠিক শিক্ষা পায়। শিক্ষা আর ব্যবসার মধ্যে যে পার্থক্য আছে সেটা ভুলে গেলে চলবেনা। 

পাঠকের মতামত শোনার জন্য অপেক্ষায় থাকলাম। 


 



 


 






বুধবার, ৮ জুলাই, ২০২০

Bangla Limerick

পিপঁড়েরা সারি বেঁধে করে হুড়োহুড়ি,
খাবার - দাবার মুখে নিয়ে করছে বদল বাড়ি ।
ছোটবেলায় শিখিয়েছিল
আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিল,
ওদের কাজের মানে হল আসছে বৃষ্টি ভারী ।।

কালো মেঘ আসছে দেখ, আসছে ভিজে দিন,
বেতারে তা জানালো বটে, বাজলো খুশীর বীণ ।
এল বৃষ্টি ছোট্ট করে
রাস্তাটুকুও ভিজলো না রে,
পিপঁড়ে, মানুষ অবাক হয়ে ঘামলো সারাদিন ।।



শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২০

বৃষ্টি নাই (No rain)

বৃষ্টি বিহীন মেঘের মেলা
হায় ! গগনে যায় ভেসে -
রোদের মাঝে দু চার ফোঁটা
পড়ল গায়ে এসে।

যখন সূর্য ডোবার রঙের বাহার
আকাশেতে ভাসে,
সব কিছুই ভুলে তখন
কবির মন হাসে।


০৪/০৭/২০২০

রবিবার, ২৮ জুন, ২০২০

বর্ষার দিনে (On a rainy day)

নিষেধের বেড়ার আর কতদিন বাকি,
অলস মন দেয় সব কাজে ফাঁকি,
ঘন বর্ষার দিনে তাই জানালায় বসে -
শুধু বর্ষার রূপ দেখি মনের হরষে।

কালো মেঘের ঘটা দেখি আঁধার দিবসে,
আনন্দে ওই নভোচর ওড়ে আকাশে,
দামাল হাওয়ায় দুলে বনরাজি জাগে -
বারিধারা নাচে মেঘমন্দ্রিত রাগে।





রবিবার, ১৪ জুন, ২০২০

কি মুশকিল !! (What a problem !!)

আজ সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে দেখি চারিদিক মেঘে অন্ধকার, বৃষ্টি হব হব। মনটা আনন্দে নেচে উঠলো, ভাবলাম কিছু লিখি। প্রথমেই মনে হলো - "সকাল বেলার বাদল আঁধারে" - তারপর মনে হলো এটা তো উনি লিখে গেছেন, অতএব অন্য কিছু লিখতে হবে।

ইতি মধ্যে শুরু হলো বৃষ্টি, সাথে হাল্কা হাওয়া - বলে উঠলাম, "আবার কি এলো রে বাদল..."
ওঘর থেকে গিন্নী বলল, "তুমি গানটা জানো ? ওটা তো আমি গাই।"
"সে কি ? কার গান ?"
উত্তর এলো, "নজরুলের।"
বুঝলাম কেন কথাগুলো অত সহজে মনের মধ্যে নেচে উঠেছিল।

নাঃ ! নতুন কিছু লিখব.... ভাবতে ভাবতে বৃষ্টি থেমে গেল, মেঘের কোলে রোদ হাঁসলো - এই দেখেছো ?
আবার উনি ঢুকে পড়লেন !! ওনাকে বাদ দিয়ে লিখতে হবে - দূরে কিছু ব্যাঙ ডাকা শুরু করলো - তা ব্যাঙ দিয়ে তো বুনিয়াদি বিদ্যালয়ের কবিতা হয়, তার ওপরে উঠতে গেলে অন্য কিছু চাই।

এমন সময়ে আবার এলো বৃষ্টি ঝমঝমিয়ে।  কত কথা মনে ভেসে এলো, সবই দেখি ওই পাঁচ কবির মধ্যে কারুর না কারুর লেখা। বেশ বুঝতে পারলাম যে ওনাদের পরে বাংলা ভাষায় বৃষ্টি, মেঘ, মেঘের গভীরে ডমরুর আওয়াজ নিয়ে লেখার জন্য যা পড়েছিল, সেটা জীবনান্দ, পুলক জেঠুর মত  আরও কিছু কবি লিখে ফেলেছেন। আমাদের মত লেখক, (খক-খক ও বলা যেতে পারে ) যাদের প্রতিভার জায়গায় প্রতিভার হাল্কা আভা আছে মাত্র, তাদের পক্ষে সাহিত্য রচনা করা বেশ কষ্টকর ব্যাপার।

অন্য কোনদিন চেষ্টা করবো। অন্য বিষয় নিয়ে।





শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২০

বর্ষা কি এল ? (Have the rains arrived ?)

জ্যৈষ্ঠ মাসেই নামল বর্ষা
মেঘের আঁচল ধরে,
ভেসে উঠল সেই সোঁদা গন্ধ
শ্যামল বনানী ভরে।

ভিজে পাতায় নাচন লাগে,
বাজে মেঘের গুরু গুরু -
আষাঢের তো এখনও দেরি
বর্ষা সত্যি হলো শুরু ?

জলের পরশে মনের হরষ
বাড়বে কি চারিদিকে ?
তাই যদি হয় তো খুবই ভাল
এই বর্ষা যেন থাকে।


১২ জুন ২০২০

বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২০

Cyclone Amphan

ঝড়ের দাপট থেমে গেল রাতে,
হলো চারিদিক নিঃশ্চুপ -
সকাল বেলায় ফিরে দেখে সব
ধ্বংসাবশেষের স্তূপ ।

বৃক্ষ উপাড়ি, ঘর দোর ভাঙি
নির্দয় ছিল লীলা,
কত হাহাকার এল কত ঘরে -
কত জীবন - মরণ খেলা।

আমফান নামে এসে রচিল প্রলয়
জল ও হাওয়ার দানব,
ঘন্টা ছয়েকের তান্ডব লীলায়
কত সে অসহায়, বুঝিল মানব। .

২১ মে, ২০২০



মঙ্গলবার, ১৯ মে, ২০২০

Cyclone Amphan (আগমনী বার্তা)


আকাশে অংশত কালো মেঘ, কিছু অংশ সাদা 
বৃষ্টিপাত হালকা বা মাঝারি, প্রবল কিছু হয়নি দাদা। 
দমকা হাওয়া দোলাচ্ছে আম, নিচে পড়ছে নাকো কিছু 
ছুটির আমেজ এই লকডাউনে ছাড়ছে না গো পিছু। 

বুধবার সকাল, ২০শে মে ২০২০



মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ, ২০২০

নামের নামাবলী (The story of a name)

বহুদিন ধরে লোকে আমায় জিজ্ঞেস করে আমার নাকি ভারী সুন্দর নাম, কিন্তু সেটা ব্যবহার না করে কেন শুধু "D" লিখি। বলে বোঝাতে পারিনা সে কি ব্যাথা - তাই এই গল্পটা লিখতে বসলাম।

এই গল্পের সুত্রপাত সেই নার্সারী থেকে; বাবা - মা আদর করে দুটো নাম দিয়েছিলেন - ডাকনাম "আনন্দ" আর ভালো নাম "dhrubojyoti" । বলা বাহুল্য, আমার গুষ্টিতে সবারই এই রকম বড় বড় নাম  - কাগজে এক আঙুল বড় অক্ষরে লিখে সুতো দিয়ে গাঁথলে গলায় মালা করে পরা যায়। 

ডাকনামটি নাকি বুদ্ধের কোন শিষ্যের নাম ছিল, আর ভালো নামটি দুটো সংস্কৃত শব্দকে জুড়ে বানানো - dhrubo আর jyoti । সংস্কৃততে  অবশ্য ওটা dhruv আর jyoti, যেটা কি না ধ্রুবতারার আলো। আমরা বাংলায়  "V", "Bh" আর "B" কে ঘেঁটে এক করে দিয়েছি বহুকাল আগে, তাই আমার নামের বানানটা ওইরকম।

এ তো গেল নামের কথা, এবার বলি আমার পদবীর কথা - Kar; এই শব্দটি বাংলায় একসাথে বিশেষ্য  এবং ক্রিয়াপদ, বড় বিটকেল। "কর" মানে শুল্ক, পাণি, কিছু করার হুকুম - ছোটবেলায় অত বুঝিনি, পরে জেনেছি।

এইরকম স্থিতিতে "আনন্দ কর" নামটা বন্ধুদের খোরাক হবে, এটাই স্বাভাবিক। হয়েছিলও তাই। সে গল্পটা পরে বলছি  ... Dhrubojyoti নিয়ে আমার জীবনের লড়াইটা আগে বলি। 

পড়তাম কনভেন্ট স্কুলে, যেখানে ইংলিশ আর হিন্দী বেশী চলতো। প্রথম শ্রেণীতে ইংলিশ শ্রুতিলিখন পরীক্ষায় পেলাম 50 এ  48, সব বানান ঠিক, শুধু নিজের নামের বানান ভুল !! এই লীলা চলেছিল তৃতীয় শ্রেণী পর্য্যন্ত - তারপর শুরু করলাম "D" লেখা।  তাতে এক নম্বর করে কাটত - 50 তে 49...। 

অষ্টম শ্রেণীতে উঠে চলে গেলাম একটি ছেলেদের সরকারি স্কুলে, যেখানে সবকিছু বাংলায় পড়ানো  হতো।  সে অভিজ্ঞতা একটা সম্পূর্ণ অন্য গল্প, পরে কোনদিন লিখব, আপাততো নামের কান্ডটা বলি।

নতুন বন্ধুদের জানালাম আমার ডাকনাম "আনন্দ " - ব্যাস, আর যাই কোথায় !! রোজ ক্লাসে ঢুকতেই সবাই গৌর - নিতাই এর মত হাত তুলে চেঁচাতো "আনন্দ কর, আনন্দ কর" বলে। কিছুদিন সহ্য করে, আমিও পালের গোদা দুটোকে চিনে নিয়ে শুরু করলাম।

একজনের নাম ছিল "নব কুমার রায়" - তাকে নিয়ে কবিতা সৃষ্টি হল :-

"নব কুমার রায় পাল্কী  চড়ে যায়,
পাল্কী থেকে বউ পালালো, করে হায় হায় !!"

অন্যটার জন্য কি করেছিলাম মনে নেই, আমার সেই স্কুলের সহপাঠীরা যদি এটা পড়ে, হয়তো মনে করিয়ে দিতে পারবে।  এই পাল্টা আক্রমণে তো "আনন্দ কর" নিয়ে আনন্দ করা বন্ধ হলো - Dhrubo নামটা প্রচলিত হলো।

স্কুলের গণ্ডি অতিক্ৰম করে কলেজে গিয়ে কি করে আমার পরিচয় "DK" হলো মনে নেই, তবে কলেজে দুটোই চলতো - DK আর Dhrubo । কলেজে কিছু বন্ধু আমার ডাকনামটা জানতো - সেটাকে ছোট করে "Ando" বানিয়ে দিয়েছিলো। 

আমি ছোটবেলায় এক জাপানি ভদ্রলোকের কাছে সাঁতার শিখেছিলাম। সেই গল্পটা কলেজের বন্ধুদের বলতেই ওরা সাথে সাথে আমার নাম পাল্টে "Ando Nigamuchi" করে দিল। সেই নাম নিয়ে অনেকদিন কেটেছে - মাঝে মাঝে রাগ হত, অভিমান হত,কিন্তু হোস্টেল জীবনে অনেকেরই অনেক নাম থাকে, তাই ওই নামটা জীবনের অঙ্গ হিসেবে নিয়ে নিয়েছিলাম। 

 চাকরিজীবনে ঢুকে নতুন করে ধাক্কা  - প্রথম মাইনের চেক পেয়ে কি আনন্দ (এটা মনের আনন্দ - আমি নই) - তারপর দেখি চেক এ  নাম লেখা আছে "Dhurbojyothi Kar" !! আমাদের একাউন্টেন্ট ছিল দক্ষিণ ভারতের,  সে আমার নামে প্রথম একটা "h" ঢুকিয়ে দিয়ে "Dhrubo" কে ঘেঁটে "Dhurbo" করে ক্ষান্ত হয়েছে।  ব্যাংকে গেলাম, ওরা চেকটা নিয়ে একটু নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে জমা নিয়ে নিলো, বললো, পরের মাসে নামের বানানটা ঠিক করে নিতে। 

কোম্পানির একাউন্টেন্ট কে গিয়ে বললাম - সে sorry বলে একটা খাতায় লিখে রাখলো।  দ্বিতীয় মাসের চেক এল, তাতে লেখা "Dhurbo Jyothi Kar" - আমি একটু চিন্তা নিয়েই ব্যাংকে গেলাম।  এবার ব্যাঙ্ক এর লোকটা আমাকে পাঠালো ওর ম্যানেজারের কাছে। সেই ভদ্রলোক আমার প্রজেক্ট ম্যানেজার কে ফোন করে কথা বলে চেক জমা দিতে বললেন।  কাজ হলো - মনে শান্তি। অফিসে ফিরে আবার সেই একাউন্টেন্ট কে গিয়ে ধরলাম - সে যথারীতি ক্ষমা চেয়ে নিয়ে একটা খাতা এগিয়ে দিয়ে বললো আমার নামটা গোটা গোটা অক্ষরে লিখে দিতে।  দিলাম। 

তৃতীয় মাসের চেক পেলাম, তাতে নাম লেখা - "Dhurba Jyothikar" !! এবার ব্যাঙ্কের লোকটা হাত তুলে দিল। চেক জমা নিল না। এতো কান্ড করেও সেই একাউন্টেন্ট ব্যাটা নামের বানান ঠিক তো করেইনি, আর "h" টা কেও ছাড়েনি !!

আমার তখন দিন আনি দিন খাই অবস্থা !! কত টাকাই বা মাইনে  - চেক অচল - প্রজেক্ট ম্যানেজার কে গিয়ে বললাম এই কাহিনী - হয়তো কান্নাকাটিও করেছিলাম, মনে নেই।  তিনি কি করছিলেন জানিনা, তবে পরের মাস  থেকে "Dhrubojyoti Kar" চেকের আসনে স্বগৌরবে অধিষ্ঠিত হয়েছিল। 

জীবনে বহুবার ভেবেছি, এই নামের বানান ভুল করার জন্য মায়ের কাছে এত যে কানমলা খেয়েছি, তার কি দরকার ছিল ? হয়তো ছিল, তাই  আমি ছাড়া আর সবাই  এই নামটা বানান করতে গিয়ে ল্যাজে - গোবরে হয়েছে। 

এর কয়েক বছর পরের ঘটনা। গেলাম ভিয়েতনাম। ওদের ভাষা সম্পূর্ণ রূপে আলাদা - এক একটি শব্দ এক একটি আওয়াজ মাত্র, আর একটি কথার অনেক মানে হয় - যেমন "নাম"।  নাম মানে 5, নাম মানে পুরুষমানুষ, নাম মানে দেশ, ইত্যাদি।  অথবা ধরা যাক "মুই " - এই শব্দটার মানে 10, মশা, বৃষ্টি, নুন হতে পারে, ব্যবহারের উপরে নির্ভর করে। ও ভাষায় প্রতিশব্দ বলে কিছু নেই। 

অফিসের সহকর্মীরা আমার পুরো নাম উচ্চারণ করার প্রবল চেষ্টা করেছে অনেকদিন ধরে - মুখ বেঁকিয়ে, চোখ বন্ধ করে, থুতু ছিটিয়েও পারেনি। যে চারটি শব্দ দিয়ে আমার নাম তৈরী, সেটা মনেই রাখতে পারতোনা।  শেষে ওদের বললাম আমাকে "Mister Kar" বলে ডাকতে।  সেই থেকে আমার পরিচয় হলো - মিত্তাকা !! 

একদিন, ভিয়েতনাম সরকারের এক উচ্চপদস্থ আধিকারিক আমাকে বলল আমার নামটা চারটে শব্দে ভেঙে লিখতে।  আমি লিখলাম - "dhru - bo - jyo - ti"।  সে বেচারা অন্যদের মত "dhru" - তেই আঁটকে গেল। কিছুক্ষন ভেবে বলল, তোমাকে "bo - jyo - ti" বলে ডাকব ? আমি বললাম না, ওই কথার কোন মানে হয়না।  

ওদের ভাষায় "bo" মানে গরু, ভেবেছিল বোধ হয় ওদের ভাষার মত আমাদেরও প্রতিটি শব্দের একটি করে মানে আছে। আমি আবহাওয়া হাল্কা করার জন্য বললাম - "call me D Kar";  সে একগাল হেঁসে মাথা দুলিয়ে বলল, "Hello Dika" !! যতদিন ভিয়েতনামে ছিলাম, আমার এই দুটো নাম প্রচলিত ছিল - "Mittaka" আর "Dika" !

এরপরে যে দেশেই গেছি আজ পর্য্যন্ত, লক্ষ্য করেছি ওরা আমার নাম উচ্চারণ করতে পারেনি সহজে।  "Dhru" শব্দটা সর্বদাই দাঁড়িয়ে পড়েছে পর্বতাকার বাঁধা হয়ে। মাঝে আমার এক আমেরিকান বস ছিল  - সেও দু-তিন বার চেষ্টা করে বলেছিল, "Never mind, I'll call you D" !!

সেই থেকে আমি "D" পরিচয় গ্রহণ করেছি। 

 ধ্রুবতারার ধ্রুবজ্যোতি  রাতের আকাশেই শোভা পাক।