রবিবার, ২৪ ডিসেম্বর, ২০১৭

The Kanchan Tree ( কাঞ্চন গাছ )

কাঞ্চন গাছ

ছোটবেলায় আমাদের বাগানের এক কোণে একটা কাঞ্চন গাছ ছিল।  খুব সুন্দর দেখতে ছিল গাছটি, যেন কেউ ওটাকে হাতে করে গড়ে নিটোল ভাবে বানিয়েছে।  যখন ওই গাছে ফুল হত, তখন কত পাখি আসতো অবাক হয়ে দেখতাম।  আজ এতো বছর পরে ছোটবেলার অনেক স্মৃতি হারিয়ে গেছে বটে, তবে ওই গাছটার ছবি আজও মনের মধ্যে উজ্জ্বল। 

ছোটবেলায় মায়ের সাথে সব্জি খাওয়া নিয়ে যুদ্ধ বোধ হয় সবাই করেছে।  আমিও তাদের মধ্যে একজন - সিম, বাঁধাকপি, ভিন্ডি, পটল, ঝিঙে নিয়ে প্রায় দুবেলাই লাগতো ঝগড়াঝাঁটি, তর্কাতর্কি, কান্নাকাটি, আর মায়ের কড়া শাসনে সবই খেতে হত। 

ঠিক করেছিলাম বড় হয়ে এমন দেশে যাব যেখানে অন্ততঃ পটল, ভিন্ডি আর ঝিঙে খেতে হবে না। অনেক দেশ ঘুরে দেখলাম ওই সব্জিগুলোর থেকে রেহাই পাওয়া মুশকিল।  তাও চেষ্টা করেছি এড়িয়ে যাবার, যখনি পেরেছি। 

এদের মধ্যে ফুলকপিটা অত খারাপ লাগতনা, তাও খেতে চাইতাম না। মা আমাকে একদিন বললেন, "তুই তো কাঞ্চন গাছ ভালবাসিস। এটা তো কাঞ্চন গাছ, দ্যাখ !"

দেখি ফুলকপি ছোট ছোট করে কেটে এক একটি ভাতের গোরাসে একটা করে কপির টুকরো সাজিয়ে দিয়েছেন। তারপর কাঞ্চন গাছের গল্প বলতে বলতে খাইয়ে দিলেন। তারপর থেকে যখনি ফুলকপি রান্না হত, আমার বরাদ্দ ছিল সেই কাঞ্চন গাছের গল্প। 

গল্প কি বলতেন মনে নেই, শুধু মনে আছে :
আমি : তারপর ?
মা : খাও, বলছি।  তারপর না .... খাও বলছি  ... মুখ চালাও, মুখে নিয়ে বসে থাকলে গল্প ও দাঁড়িয়ে থাকবে। 

যেই মুখ খালি হলো, আবার এক গোরোস কাঞ্চন গাছ সহ ভাত ঢুকে গেল,আর আবার সেই কথা :
আমি : তারপর ?
মা : খাও, বলছি।  তারপর না .... খাও বলছি  ... মুখ চালাও, মুখে নিয়ে বসে থাকলে গল্প ও দাঁড়িয়ে থাকবে। 

সেই কাঞ্চন গাছের গল্প শেষ বোধহয় হয়নি কোনদিন।  তার আগেই বড় হয়ে গেলাম। (কি ক্যাবলাই না ছিলাম আমি।) বাগানের গাছটা প্রতি বছর ফুলে ভরে যেত, আজও বোধহয় তাই হয়। বহুদিন ভেবেছি কাঞ্চন গাছের সাথে ফুলকপির কি সম্পর্ক ?  মা কে জিজ্ঞেস করা হয়ে ওঠেনি আর। 

আজ আমার মা আর নেই, আজও ফুলকপি খেতে গেলে কাঞ্চন গাছের কথা মনে পড়ে। 

পরিণত বয়সে একটা উপলব্ধি হয়েছে বটে - মায়েরা মিথ্যে কথা দারুণ সুন্দর গল্প দিয়ে সাজিয়ে বলতে পারে।