মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ, ২০২০

নামের নামাবলী (The story of a name)

বহুদিন ধরে লোকে আমায় জিজ্ঞেস করে আমার নাকি ভারী সুন্দর নাম, কিন্তু সেটা ব্যবহার না করে কেন শুধু "D" লিখি। বলে বোঝাতে পারিনা সে কি ব্যাথা - তাই এই গল্পটা লিখতে বসলাম।

এই গল্পের সুত্রপাত সেই নার্সারী থেকে; বাবা - মা আদর করে দুটো নাম দিয়েছিলেন - ডাকনাম "আনন্দ" আর ভালো নাম "dhrubojyoti" । বলা বাহুল্য, আমার গুষ্টিতে সবারই এই রকম বড় বড় নাম  - কাগজে এক আঙুল বড় অক্ষরে লিখে সুতো দিয়ে গাঁথলে গলায় মালা করে পরা যায়। 

ডাকনামটি নাকি বুদ্ধের কোন শিষ্যের নাম ছিল, আর ভালো নামটি দুটো সংস্কৃত শব্দকে জুড়ে বানানো - dhrubo আর jyoti । সংস্কৃততে  অবশ্য ওটা dhruv আর jyoti, যেটা কি না ধ্রুবতারার আলো। আমরা বাংলায়  "V", "Bh" আর "B" কে ঘেঁটে এক করে দিয়েছি বহুকাল আগে, তাই আমার নামের বানানটা ওইরকম।

এ তো গেল নামের কথা, এবার বলি আমার পদবীর কথা - Kar; এই শব্দটি বাংলায় একসাথে বিশেষ্য  এবং ক্রিয়াপদ, বড় বিটকেল। "কর" মানে শুল্ক, পাণি, কিছু করার হুকুম - ছোটবেলায় অত বুঝিনি, পরে জেনেছি।

এইরকম স্থিতিতে "আনন্দ কর" নামটা বন্ধুদের খোরাক হবে, এটাই স্বাভাবিক। হয়েছিলও তাই। সে গল্পটা পরে বলছি  ... Dhrubojyoti নিয়ে আমার জীবনের লড়াইটা আগে বলি। 

পড়তাম কনভেন্ট স্কুলে, যেখানে ইংলিশ আর হিন্দী বেশী চলতো। প্রথম শ্রেণীতে ইংলিশ শ্রুতিলিখন পরীক্ষায় পেলাম 50 এ  48, সব বানান ঠিক, শুধু নিজের নামের বানান ভুল !! এই লীলা চলেছিল তৃতীয় শ্রেণী পর্য্যন্ত - তারপর শুরু করলাম "D" লেখা।  তাতে এক নম্বর করে কাটত - 50 তে 49...। 

অষ্টম শ্রেণীতে উঠে চলে গেলাম একটি ছেলেদের সরকারি স্কুলে, যেখানে সবকিছু বাংলায় পড়ানো  হতো।  সে অভিজ্ঞতা একটা সম্পূর্ণ অন্য গল্প, পরে কোনদিন লিখব, আপাততো নামের কান্ডটা বলি।

নতুন বন্ধুদের জানালাম আমার ডাকনাম "আনন্দ " - ব্যাস, আর যাই কোথায় !! রোজ ক্লাসে ঢুকতেই সবাই গৌর - নিতাই এর মত হাত তুলে চেঁচাতো "আনন্দ কর, আনন্দ কর" বলে। কিছুদিন সহ্য করে, আমিও পালের গোদা দুটোকে চিনে নিয়ে শুরু করলাম।

একজনের নাম ছিল "নব কুমার রায়" - তাকে নিয়ে কবিতা সৃষ্টি হল :-

"নব কুমার রায় পাল্কী  চড়ে যায়,
পাল্কী থেকে বউ পালালো, করে হায় হায় !!"

অন্যটার জন্য কি করেছিলাম মনে নেই, আমার সেই স্কুলের সহপাঠীরা যদি এটা পড়ে, হয়তো মনে করিয়ে দিতে পারবে।  এই পাল্টা আক্রমণে তো "আনন্দ কর" নিয়ে আনন্দ করা বন্ধ হলো - Dhrubo নামটা প্রচলিত হলো।

স্কুলের গণ্ডি অতিক্ৰম করে কলেজে গিয়ে কি করে আমার পরিচয় "DK" হলো মনে নেই, তবে কলেজে দুটোই চলতো - DK আর Dhrubo । কলেজে কিছু বন্ধু আমার ডাকনামটা জানতো - সেটাকে ছোট করে "Ando" বানিয়ে দিয়েছিলো। 

আমি ছোটবেলায় এক জাপানি ভদ্রলোকের কাছে সাঁতার শিখেছিলাম। সেই গল্পটা কলেজের বন্ধুদের বলতেই ওরা সাথে সাথে আমার নাম পাল্টে "Ando Nigamuchi" করে দিল। সেই নাম নিয়ে অনেকদিন কেটেছে - মাঝে মাঝে রাগ হত, অভিমান হত,কিন্তু হোস্টেল জীবনে অনেকেরই অনেক নাম থাকে, তাই ওই নামটা জীবনের অঙ্গ হিসেবে নিয়ে নিয়েছিলাম। 

 চাকরিজীবনে ঢুকে নতুন করে ধাক্কা  - প্রথম মাইনের চেক পেয়ে কি আনন্দ (এটা মনের আনন্দ - আমি নই) - তারপর দেখি চেক এ  নাম লেখা আছে "Dhurbojyothi Kar" !! আমাদের একাউন্টেন্ট ছিল দক্ষিণ ভারতের,  সে আমার নামে প্রথম একটা "h" ঢুকিয়ে দিয়ে "Dhrubo" কে ঘেঁটে "Dhurbo" করে ক্ষান্ত হয়েছে।  ব্যাংকে গেলাম, ওরা চেকটা নিয়ে একটু নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে জমা নিয়ে নিলো, বললো, পরের মাসে নামের বানানটা ঠিক করে নিতে। 

কোম্পানির একাউন্টেন্ট কে গিয়ে বললাম - সে sorry বলে একটা খাতায় লিখে রাখলো।  দ্বিতীয় মাসের চেক এল, তাতে লেখা "Dhurbo Jyothi Kar" - আমি একটু চিন্তা নিয়েই ব্যাংকে গেলাম।  এবার ব্যাঙ্ক এর লোকটা আমাকে পাঠালো ওর ম্যানেজারের কাছে। সেই ভদ্রলোক আমার প্রজেক্ট ম্যানেজার কে ফোন করে কথা বলে চেক জমা দিতে বললেন।  কাজ হলো - মনে শান্তি। অফিসে ফিরে আবার সেই একাউন্টেন্ট কে গিয়ে ধরলাম - সে যথারীতি ক্ষমা চেয়ে নিয়ে একটা খাতা এগিয়ে দিয়ে বললো আমার নামটা গোটা গোটা অক্ষরে লিখে দিতে।  দিলাম। 

তৃতীয় মাসের চেক পেলাম, তাতে নাম লেখা - "Dhurba Jyothikar" !! এবার ব্যাঙ্কের লোকটা হাত তুলে দিল। চেক জমা নিল না। এতো কান্ড করেও সেই একাউন্টেন্ট ব্যাটা নামের বানান ঠিক তো করেইনি, আর "h" টা কেও ছাড়েনি !!

আমার তখন দিন আনি দিন খাই অবস্থা !! কত টাকাই বা মাইনে  - চেক অচল - প্রজেক্ট ম্যানেজার কে গিয়ে বললাম এই কাহিনী - হয়তো কান্নাকাটিও করেছিলাম, মনে নেই।  তিনি কি করছিলেন জানিনা, তবে পরের মাস  থেকে "Dhrubojyoti Kar" চেকের আসনে স্বগৌরবে অধিষ্ঠিত হয়েছিল। 

জীবনে বহুবার ভেবেছি, এই নামের বানান ভুল করার জন্য মায়ের কাছে এত যে কানমলা খেয়েছি, তার কি দরকার ছিল ? হয়তো ছিল, তাই  আমি ছাড়া আর সবাই  এই নামটা বানান করতে গিয়ে ল্যাজে - গোবরে হয়েছে। 

এর কয়েক বছর পরের ঘটনা। গেলাম ভিয়েতনাম। ওদের ভাষা সম্পূর্ণ রূপে আলাদা - এক একটি শব্দ এক একটি আওয়াজ মাত্র, আর একটি কথার অনেক মানে হয় - যেমন "নাম"।  নাম মানে 5, নাম মানে পুরুষমানুষ, নাম মানে দেশ, ইত্যাদি।  অথবা ধরা যাক "মুই " - এই শব্দটার মানে 10, মশা, বৃষ্টি, নুন হতে পারে, ব্যবহারের উপরে নির্ভর করে। ও ভাষায় প্রতিশব্দ বলে কিছু নেই। 

অফিসের সহকর্মীরা আমার পুরো নাম উচ্চারণ করার প্রবল চেষ্টা করেছে অনেকদিন ধরে - মুখ বেঁকিয়ে, চোখ বন্ধ করে, থুতু ছিটিয়েও পারেনি। যে চারটি শব্দ দিয়ে আমার নাম তৈরী, সেটা মনেই রাখতে পারতোনা।  শেষে ওদের বললাম আমাকে "Mister Kar" বলে ডাকতে।  সেই থেকে আমার পরিচয় হলো - মিত্তাকা !! 

একদিন, ভিয়েতনাম সরকারের এক উচ্চপদস্থ আধিকারিক আমাকে বলল আমার নামটা চারটে শব্দে ভেঙে লিখতে।  আমি লিখলাম - "dhru - bo - jyo - ti"।  সে বেচারা অন্যদের মত "dhru" - তেই আঁটকে গেল। কিছুক্ষন ভেবে বলল, তোমাকে "bo - jyo - ti" বলে ডাকব ? আমি বললাম না, ওই কথার কোন মানে হয়না।  

ওদের ভাষায় "bo" মানে গরু, ভেবেছিল বোধ হয় ওদের ভাষার মত আমাদেরও প্রতিটি শব্দের একটি করে মানে আছে। আমি আবহাওয়া হাল্কা করার জন্য বললাম - "call me D Kar";  সে একগাল হেঁসে মাথা দুলিয়ে বলল, "Hello Dika" !! যতদিন ভিয়েতনামে ছিলাম, আমার এই দুটো নাম প্রচলিত ছিল - "Mittaka" আর "Dika" !

এরপরে যে দেশেই গেছি আজ পর্য্যন্ত, লক্ষ্য করেছি ওরা আমার নাম উচ্চারণ করতে পারেনি সহজে।  "Dhru" শব্দটা সর্বদাই দাঁড়িয়ে পড়েছে পর্বতাকার বাঁধা হয়ে। মাঝে আমার এক আমেরিকান বস ছিল  - সেও দু-তিন বার চেষ্টা করে বলেছিল, "Never mind, I'll call you D" !!

সেই থেকে আমি "D" পরিচয় গ্রহণ করেছি। 

 ধ্রুবতারার ধ্রুবজ্যোতি  রাতের আকাশেই শোভা পাক।