ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি প্রকৃতির সাথে মিলে মিশে থাকলে সর্বাঙ্গীন উন্নতি হয়। কি উন্নতি হয় সেটা অবশ্য এখনও জানা যায়নি। আজও বিভিন্ন লেখা প্রকাশনী পড়লে বিভিন্ন মতামত পাওয়া যায়।
আমার ছোটবেলায় স্কুলের জন্য একটি কালো জুতো আর একটি সাদা জুতো (কেড্স ) ছিল আর বাকি সময় খালি পায়ে দৌড়ে বেড়াতাম - কাঁটা ফুটেছে, রক্ত ঝরেছে, তবুও খেলা বন্ধ হয়নি। পেয়ারা গাছের ব্যাঁকা ডালের টুকরো আর ছাল উঠে যাওয়া টেনিস বল দিয়ে প্রচুর ক্রিকেটও খেলেছি।
স্কুল শেষে বাড়ি ফিরে খাবার খেয়েই বাগানের পেয়ারা গাছে আমার আর আমার দিদির দুপুরটা কাটতো। আর নয়তো গরমকালে অন্য লোকের বাগান থেকে কাঁচা আম চুরি। আমি গাছে উঠতাম আর দিদি নিচে দাঁড়িয়ে স্কার্ট এ আমগুলো কুড়োত।
বাবার বাগান করার শখ ছিল, ফুলের সাথে বাগানে পাখি, প্রজাপতি, ড্রাগনফ্লাই, সাপ, ব্যাঙ, কেঁচো, ঝিঁঝি পোকা, সবই থাকত। ওদের মধ্যে বড় হতে হতে ওদের ভালোবাসতে গিয়ে প্রাণ হানিও ঘটিয়েছি অনেক বার। বেশ কিছু প্রজাপতি, ড্রাগনফ্লাই, কেঁচো, শালিক ও চড়ুইপাখি আমার আদর করে খাওয়ানোর প্রচেষ্টায় ভবলীলা সাঙ্গ করে পগার পার হয়েছে .... ওদের পরলোক আছে কি না জানিনা, যদি থাকে, তো সেখানেই গেছে।
বেশ মনে আছে একবার একটি মৃত শালিককে বাগানের কোণে গর্ত করে পুঁতেছিলাম, তার সাথে আমার একটি ক্যাপ ফাটানো পিস্তলও পুঁতেছিলাম। তখন সবে ইতিহাস পড়তে শুরু করেছি, প্রত্নতত্ত্ববিদদের কথা জেনেছি, উদ্দেশ্য ছিল ওদের তাক লাগিয়ে দেওয়া - "আজ থেকে হাজার বছর পরে যদি কেউ ওই শালিকটাকে খুঁজে পায়, তাহলে তার সাথে আমার পিস্তলটা দেখে অবাক হবে".... যাক সে কথা।
আর থাকত কুকুর। পাড়ার মধ্যে গোটা দশেক কুকুর ঘোরাঘুরি করত। প্রতি বছর সেই কুকুরের বাচ্ছা হলে আমাদের সে কি আনন্দ !!! কুকুরছানা নিয়ে খেলা !! বেশিরভাগ ছানাগুলো কোনো না কোনো কারণে মারা যেত, দু-একটা বাঁচতো।
যখন আমি তৃতীয় বা চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ি, তখন আমাদের বাগানের এক কোণে একটি কুকুরের বাচ্ছা হয়েছিল। তাদের মধ্যে কুচকুচে কালো একটি ছানা, তার তখনো চোখ ফোটেনি, আমার নজরে পড়ে গেল ... ব্যাস, আর কী ? দিদির আর আমার আদর-যত্ন শুরু হয়ে গেল। একটু বড় হতেই বুঝলাম এই ছানাটা অন্যদের থেকে আলাদা - বাকি দুটো ছানা বেশ মোটাসোটা হয়ে উঠল এটা রয়ে গেল হাড়গিলে রোগা। এমনই রোগা যে ল্যাজ নাড়লে ল্যাজের থেকে বেশি ওর গা টা দুলতো। নাম দিলাম "ল্যাকপ্যাক"। নামটা টিকে গেল কেমন করে, পাড়ার সবাই ওকে ওই নামে ডাকত। আমার গলা চিনতো - শুধু একবার ল্যাকপ্যাক বলে ডাকলেই যেখানেই থাকুক ছুটে চলে আসতো। সাপ দেখতে পেলে গা কাঁপিয়ে বকাবকি করে আমাদের সাবধান করে দিত।
ল্যাকপ্যাক বহুদিন বেঁচে ছিল, কলেজে ভর্তি হয়ে চলে যাবার কিছুদিন পরে শুনলাম ও মারা গেছে। খুব দুঃখ হয়েছিল। হাকুচ কালো কুকুরটি চোখ দিয়ে কথা বলতো - সেই কথা আমার শিশুমনের সৃষ্টি হতে পারে, তবে আজও তার সেই চোখের দৃষ্টি আমার স্মৃতিতে বিরাজমান।
দেখতে দেখতে কখন যে বড় হয়ে চাকরি-বাকরি সুত্রে শহরবাসী হয়ে গেলাম বুঝতে পারিনি। কলকাতার পাড়াতে আগে দেখেছি এদিক-ওদিক কিছু ফুল ফুটতে, তার সাথে কিছু প্রজাপতি ঘোরাঘুরি করত। মাঝে মাঝে ব্যাঙের ডাক আর ঝিঁঝি পোকার আওয়াজ শোনা যেত। ইদানিং লক্ষ্য করছি সব কেমন স্তব্ধ হয়ে গেছে। আজকাল বৃষ্টি পড়লে কচিত কখনো দু-একটা ব্যাঙের ডাক শোনা যায়, প্রজাপতি আর ড্রাগনফ্লাই তো দেখাই যায়না।
তাহলে কি হবে, প্রকৃতির মাঝে বড় হবার অভ্যাস যাবে কোথায় ? পাড়ার কুকুরগুলো তো আছে !! তাদের প্রতি নজর থাকে - বহুবার গভীর রাতে কুকুরছানার করুণ ডাকে ঘুম ভেঙেছে, বাইরে বেরিয়ে, তাদের ড্রেন থেকে উদ্ধার করে টিউব ওয়েলএর জলে ধুইয়ে অন্য জায়গায় রেখে এসেছি।
কালে কালে আমার গিন্নিও ওদের প্রেমে পড়ে গেছে। রোজ বিসকুট কিনে খাওয়ানো শুরু হয়েছে বেশ কয়েক বছর। দু-একটাকে হাসপাতালেও পাঠানো হয়েছে রোগ সারাবার জন্য। রাস্তার কুকুরের এতো যত্ন খাতির দেখে আমি ওকে "সারমেয় সেবা সমিতির সভাপতি" উপাধি দিলাম - তাতে উল্টো ফল হল - বিস্কুটের দৈনিক পরিমান বেড়ে গেল।
এখন ওই কুকুরগুলো জেনে গেছে কি করে বেশি বিসকুট পেতে হয় - গেট থেকে পা বাড়ালেই ছেঁকে ধরে। আমি তো বকে ধমকে বেরিয়ে যাই, ও বেচারি সেটা পারেনা, ওর শাড়িতে ওদের আদরের পায়ের ছাপ পড়ে যায়।
এই ভাবেই চলছে ... আমাদের খাওয়ার কোনো উচ্ছিষ্ট থাকেনা। দুপুরে খাওয়ার শেষে মাছের কাঁটা আর একটু আধটু সব্জির অংশবিশেষ বাইরে রাস্তায় ফেলতেই কাকগুলো তুলে নিয়ে যায়, মাঝে মাঝে মাটিতে পড়ার আগেই ওদের মুখে উঠে যায়। একটি কাকের ছানা, সবে উড়তে শিখেছে, মানুষ কে ভয় পেতে শেখেনি, কখনো কখনো এসে বারান্দার গ্রিলের পাশে বসে থাকে এই খাবারের আশায়।
রাতে মাংস খাওয়া হলে হাড়গুলো সেই সারমেয়র দল পায়। বিসকুট খাবার পর ওটা উপরি পাওনা। ওপর থেকে হাড়গুলো ছুঁড়ে দেই, ওরা কিনতু নিজেদের মধ্যে কাড়াকাড়ি করেনা - যার সামনে যেটা পড়ল সে সেটাই খায়।
এ এক আশ্চর্য্য, সীমিত মিথোজীবী সম্পর্ক !!
***
সেই দিন এই ভাবে রাতের বেলা হাড়গুলো ছুঁড়ে দিলাম, একটি কুকুর দেরি করে এলো, কিছুই পেলো না। আমার দিকে একবার ওপরে তাকালো, হালকা ল্যাজ নেড়ে চলে গেলো - হয়তো বললো, "পরের বার মনে রেখো..."
নিজেকে বললাম, "নিঃশ্চই চেষ্টা করব ......"
খুব সরল ভাষায় খুব গভীর ভাব ... আমার খুব ভালো লেগেছে। দারুণ!
উত্তরমুছুনAs usualy good... Ekhane ami chalie jachhi kuchhu ta... Chotobyalai moton
উত্তরমুছুনBhalo laglo as usual good... Ekhane ekhono ami kichuta chalie jachhi... Chotobyalar moton
উত্তরমুছুনsobai ke dhonyobad.....
উত্তরমুছুনKhub enjoy korlam lekhata!
উত্তরমুছুনEnjoyed very much
উত্তরমুছুনBALER BHAB
উত্তরমুছুন