আজকাল লোকে তো কলম দিয়ে লেখাই ভুলতে বসেছে ... হয় কম্পিউটারের কিবোর্ড আর না হয় ফোনে বুড়ো আঙ্গুল দিয়েই সব বক্তব্য প্রকাশ করে ফেলে। পরবর্তী প্রজন্মর তো বুড়ো আঙুলে ব্যাথা, কব্জিতে অস্ত্রপচার, কত কি হচ্ছে এই কিবোর্ড আর ফোন টেপার দয়ায়।
মাঝে মাঝে ভাবি, আমরা ছোটবেলায় এতো বকুনি, এতো শাস্তি পেয়েছি, খারাপ হাতের লেখার জন্য, এমন কি পরীক্ষায় কম নম্বরও পেয়েছি - সবই কি বৃথা গেল ? এখন আমিও তো সংসারের হিসেব আর চেক সই করা ছাড়া কলম ব্যবহার করিনা।
যাকগে, আসল গল্পটাতে আসি....আজ থেকে প্রায় তিরিশ বছর আগেকার কথা - তখন অত কম্পিউটারের ছড়াছড়ি হয়নি, সবেমাত্র কিছু জায়গায় কম্পিউটার বসতে শুরু করেছে। তখন প্রায় সব অফিসেই স্টেনোগ্রাফার আর সেক্রেটারিদের দল সারাদিন টাইপরাইটার এ টরেটক্কা করে জীবন কাটাতো। চিঠিপত্র ডাকঘর বা কুরিয়ার দিয়ে যেত, আর না হলে ফ্যাক্স।
সেই সময়ে বিভিন্ন অফিসের বড় বাবুরা পকেটে তিন চারটে কলম নিয়ে ঘুরে বেড়াতো। যার যত ক্ষমতা, তার তত বেশি কলম। ম্যানেজারদের পকেটে তো গোটা তিনেক কলম থাকতই, টেবিলে সাজানো থাকত আরও গোটা চারেক।
আমি যে কোম্পানিতে কাজ করতাম, তারা কম্পিউটার এবং আনুসাঙ্গিক অনেক কিছু বেচতো, আমিও ছিলাম এক প্রকারের বেচুদা। একটি সংস্থা কে কোম্পানি কিছু মালপত্র দিয়েছিল, বিক্রি-বাটা হয়েছিল তখনকার বম্বে শহরে। সেই সংস্থার হেডঅফিস ছিল কলকাতায়। আমি এই ব্যাপারে জানতেও পারতাম না, যদি সব কিছু ঠিক ঠাক থাকত।
হলো কি, তারা প্রায় ছয় মাস বেশ কিছু টাকা বাকি রেখে দিল - ব্যাপারটা আমাদের হেডঅফিসে গেল, সেখান থেকে আমার ওপর হুকুম হলো ওদের হেডঅফিস থেকে টাকা বার করার, কারণ আমার কলকাতার অফিস থেকে ওদের হেডঅফিস হাঁটা পথে পাঁচ - ছয় মিনিটের রাস্তা।
তখন অল্প বয়স, দারুণ উদ্যোগ নিয়ে চলে গেলাম ওদের অফিসে, একেবারে সোজা চারতলায়, যেখানে ওদের সব প্রেসিডেন্ট আর ভাইসপ্রেসিডেন্ট বসতো। জনৈক ভদ্রলোককে জিজ্ঞেসাবাদ করে, এই কেনা-বেচার মালিক যে ছিল, তার কাছে পৌঁছে গেলাম। তিনি একজন ভাইসপ্রেসিডেন্ট। বাঙালি।
আমাকে বসতে বললেন, সবিস্তরে পুরো কাহিনী শুনলেন, মস্ত বড় জীভ কেটে বললেন, "আপনারা এখনো টাকা পাননি ? কি লজ্জার কথা !!" আমি একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম।
বললেন, "ইনভয়েস এনেছেন ?" আমি সাথে সাথে ওনাকে ব্যাগ থেকে ইনভয়েস বার করে দিলাম। ডুপ্লিকেটে। উনি পড়ে দেখে বললেন, "দেখুন তো, কি কান্ড ? আমি এটা সই করে দিচ্ছি, আপনি ছয়তলায় গিয়ে একাউন্টস সেক্শনে জমা করে দিন।"
"কবে টাকা পেতে পারি ?"
"আগে ইনভয়েসটা জমা করুন তো, তারপর দেখছি", এই বলে, পকেট থেকে সবুজ কলম বার করে লিখে দিলেন - "please pay immediately."। তারপর সই করে তারিখ দিলেন। আমি খুশি মনে ধন্যবাদ জানিয়ে চলে গেলাম ছয়তলায়। মনে মনে ভাবলাম এটা কি সহজ কাজ, যদি করে দিতে পারি তো নিশ্চয়ই নাম কিনব।
ছয়তলায় গিয়ে দেখি সব তিলকধারি, গেরুয়া বসন-পরিহিত মুনীবজিদের ছড়াছড়ি। তারাই নাকি একাউন্টস ডিপার্টমেন্ট !! টেবিল - চেয়ার নেই, সবাই ধব-ধবে সাদা চাদর মোড়া তাকিয়াতে বসে মস্ত বড় বড় লাল খাতায় ব্যস্ত হয়ে হিসেব করছে। কম্পিউটার একটাও নেই। একবার মনে ভাবলাম যে এতো টাকা দিয়ে যে দুটো কম্পিউটার কিনেছে সেগুলো কই ?
বেশি কিছু ভাববার আগেই একজন বললো, "কিসসে মিলনা হায় ?" আমি নাম বললাম। সে আমাকে ঘরের কোণে এক বৃদ্ধ মানুষকে দেখিয়ে দিল। গেলাম তার কাছে। সে কোনো কথা না বলে হাত বাড়িয়ে দিল। আমি ইনভয়েস গুলো দিলাম। সে পড়ে দেখে বললো, "আগলা মাহিনা কা দস তারিখ আইয়ে।" আমি বলতে গেলাম যে আমার তাড়া আছে পেমেন্ট নেবার, সে নির্বিকার চিত্তে বললো, "বোলা না, দস তারিখ কো আইয়ে।" হতাশ হয়ে অফিস ফিরে বসকে জানালাম। আরও তিন সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হবে। বস বললো, "ঠিক আছে, লেগে থেকে পয়সাটা বার করো।" .
কি আর করব ? পরের মাসে দশ তারিখে গিয়ে হাজির হলাম সেই তিলকধারী বুড়োর কাছে। দেখি ওনার আসন খালি, উনি নেই। খোঁজ খবর করে জানলাম ওই বুড়ো গত মাসে চাকরি থেকে অবসর নিয়ে চলে গেছেন !! আমার ইনভয়েস এর খবর কেউ জানেনা।
ফিরে চারতলায় গিয়ে সেই ভাইসপ্রেসিডেন্ট কে আবার ধরলাম। তিনি সব ঘটনা শুনে বললেন, "এদের যে কি ব্যাপার আমিও বুঝতে পারিনা। আপনি এক কাজ করুন - আমাকে আবার ইনভয়েস এর কপি দিন। আছে সঙ্গে ?" আমি বললাম, "না... আমি তো পয়সা নিতে এসেছিলাম, ইনভয়েস তো নেই।" উনি একটা করুণার হাসি হেসে আমাকে আবার ইনভয়েস আনতে বললেন।
"কার কাছে যাবো ?" তিনি কিছুক্ষণ আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে, কিছু ভেবে, বললেন যে ছয়তলাতে গিয়ে দেখবেন একটা ভেন্ডর সেকশন হয়েছে, সেখানে দেবেন। আমি আবার ছুটলাম ছয়তলায় সেই তিলকধারী মুনীবজিদের পাড়ায়। দেখি ভেন্ডর সেক্শনে একটি বিকট মোটা, অল্প বয়েসী ছেলে বসে আছে, যাকে দেখলেই মনে হয় রোজ সকালে জল-খাবারের বদলে মারধর খেয়ে আসে। তাকে গিয়ে বললাম, "ইনভয়েস ইধর দেনা হায় ?"
সে কি !! এ তো বিনা মেঘে বজ্রাঘাত !! আবার সেই ভাইসপ্রেসিডেন্ট এর সাথে দেখা করে অফিস ছুটলাম। বস কে জানালাম ঘটনাটা। আবার চার - পাঁচ দিন পরে ইনভয়েস এলো। নিয়ে সোজা গেলাম সেই ভাইস প্রেসিডেন্ট এর কাছে। তিনি বললেন, "আহা, আপনাকে কত ঘোরাচ্ছে।... আমি এক্ষুণি সই করে দিচ্ছি।"
আমি বললাম, "স্যার সবুজ আর নীল কলমে তো কাজ হলোনা, লাল কলমে সইটা করবেন ?" তিনি ভূত দেখার মত আমার দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন। বুঝলাম ঠিক ধরেছি !! চাপ দিলাম। "প্লিজ লাল কলমে সই করুন।" তিনি কি ভাবলেন, করে দিলেন। লাল কলমে।
ওপরে গিয়ে ইনভয়েসটা দিতেই সেই মোটকা ছেলেটা উঠে বসলো। আমাকে দেখলো তারপর ইনভয়েস নিয়ে ভেতরের ঘরে চলে গেলো। আমি কি আর করি, বাইরে হলঘরে দাঁড়িয়ে রইলাম। প্রায় আধ ঘন্টা পরে ও বেরিয়ে এলো, আমাকে দেখে অবাক। বুঝিয়ে দিলাম আমি চেক ছাড়া যাচ্ছিনে। ও বললো লাঞ্চ এর পরে আসতে। আমি বললাম, "আজ আমার উপোষ, লাঞ্চ করবনা, এখানেই বসছি, এই তাকিয়াতে, আপনারা লাঞ্চ করুন, তারপর আমাকে চেক দিন।"
সে ব্যাপারটা বেগতিক দেখে আবার ভেতরের ঘর চলে গেল। এক ঘন্টা পরে চেক পেলাম হাতে।
সেই থেকে আমার শিক্ষা হলো :
"সবুজ কলমে গোলমাল, নীল কলমেও তাই -
টাকা যদি পেতে হয়, লাল কলম চাই !!"
***
Great🤗🤗
উত্তরমুছুনদারুন লিখেছিস 👌👌👌
উত্তরমুছুনভাল লিখেছিস
উত্তরমুছুনOshadharon. 2nd time e amaro sondeho hochilo esob rong er kono khela nishchoi aache. Story is good enough to frustrate some body to leave a job.😁😁😁. As usual sabolil lekha. Jake bole jhor jhore lekha. Aro lekh.
উত্তরমুছুনSobaike dhonyobad, comment deoar jonyo !!
উত্তরমুছুনদারুণ লেখা, আরো লেখো
উত্তরমুছুনলেখাটা খুবই ভাল হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের মানুষের জন্য সময়োপযোগী ও অনুধাবনযোগ্য।
উত্তরমুছুনবিষয় তো বটেই, লেখার style-ও খুব সুন্দর।
উত্তরমুছুনওঃ, ফাটাফাটি লিখেছো!
উত্তরমুছুনAbar dhonyobad sobaike !!
উত্তরমুছুনদারুন লিখেছো DK! বেশ ভালো লাগলো পড়ে।
উত্তরমুছুন😄😄😄😄😄 aage porechhi. Abar porlam aar hanshlam. Darun. Udak ray.
উত্তরমুছুন